মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

তিনটি অতি পরিচিত প্রবাদের সারকথা

অহংকার পতনের মূল 

        অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সবার চেয়ে বড় এবং অভ্রান্ত মনে করে। এই অতি-আত্মবিশ্বাসের ফলে সে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখতে পায় না এবং অন্যের ভালো পরামর্শ গ্রহণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অন্ধত্বই তাকে ভুল পথে পরিচালিত করে। অহংকার মানুষকে উদ্ধত ও অসংবেদনশীল করে তোলে। এর ফলে সে আশেপাশের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে, যা তাকে সমাজ ও বন্ধুহীন করে দেয়। মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে এবং তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়, তখন তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। শিক্ষার মূল শর্ত হলো বিনয়। অহংকারী ব্যক্তি মনে করে সে সব জানে, তাই তার নতুন কিছু শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। জ্ঞান ও দক্ষতার এই স্থবিরতা তাকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয় এবং ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। ইতিহাস সাক্ষী যে, বড় বড় সাম্রাজ্য বা শক্তিশালী ব্যক্তিরা যখনই নিজেদের অপরাজেয় ভেবে অহংকারে মত্ত হয়েছে, তখনই তাদের পতন শুরু হয়েছে। বিনয় মানুষকে উঁচুতে তোলে, আর অহংকার নিচে টেনে নামায়

লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু

        মানুষ যখন নিজের সামর্থ্য বা যা আছে তাতে সন্তুষ্ট না থেকে অন্যায়ভাবে অন্যের কিছু পাওয়ার বা অতিরিক্ত কিছু ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা করে, তখনই লোভ জন্মায়। এই অতিরিক্ত লালসা মেটাতে গিয়ে মানুষ মিথ্যা, চুরি, প্রতারণা বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়, যাকে বলা হয় পাপ। লোভে পড়ে মানুষ তার বিবেক এবং হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে তখন ন্যায়-অন্যায়ের বিচার না করে কেবল নিজের স্বার্থ দেখে। এই মানসিক বিকৃতি তাকে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তাকে মানসিকভাবে অশান্ত ও দেউলিয়া করে তোলে। লোভে পড়ে মানুষ যখন তার মান-সম্মান, বিবেক এবং বিশ্বাস হারায়, তখন সামাজিকভাবে তার এক প্রকার মরণ ঘটে। তার অর্জিত সম্পদ তাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না। অন্যায় লালসা মানুষকে অপরাধের পথে টানে, আর সেই অপরাধই এক সময় তাকে ধ্বংস করে দেয়। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লালসা তাকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

অতি চালাকের গলায় দড়ি

        চলাফেরা বা কাজকর্মে বুদ্ধিমত্তা থাকা ভালো, কিন্তু অতি চালাকি বা ধূর্ততা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দেয়। অতি চালাক ব্যক্তি মনে করে সে সবাইকে ফাঁকি দিতে পারবে, কিন্তু এই অতি-আত্মবিশ্বাস থেকেই সে ছোটখাটো ভুল করে বসে যা পরে বড় বিপদের কারণ হয়। যারা নিজেকে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান মনে করে এবং কূটকৌশলের মাধ্যমে অন্যকে ঠকাতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারাই বিপদে পড়ে। যে ব্যক্তি সবসময় কৌশলে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, একসময় সমাজের কাছে তার আসল রূপ প্রকাশ পায়। ফলে কেউ তাকে আর বিশ্বাস করে না। বিপদে পড়লে সে তখন আর কারও সাহায্য পায় না। অতি চালাক মানুষ অন্যদের জন্য যে ফন্দি বা ফাঁদ পাতে, পরিস্থিতির ফেরফারে অনেক সময় সে নিজেই সেই ফাঁদে পড়ে যায়। অতি বুদ্ধিমত্তা দেখাতে গিয়ে নীতিহীন হওয়া শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি ডেকে আনে। সরলতা ও সততা চাতুর্যের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।

(সংগৃহীত)



 

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

সময়ের সদ্‌ব্যবহার

    সময়ের মূল্য আছে, তাই নিজের এবং অন্যের- কারোরই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। কারো আয়ু যদি ৭০ বছর হয় এবং তার অর্ধেক সময়ই যদি সে নিজের অগ্রগতি এবং উন্নতির জন্য কাজে লাগাতে না পারে তবে এক অর্থে তার অর্ধেক জীবনটাই বিফলে যায়। এগিয়ে যাওয়াই জীবন, এবং ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করাটাই স্বাভাবিক। ‘নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও’ - সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটা উন্নত সমাজ, রাজ্য ও দেশ গড়ে ওঠে। একটি গাছের চারা লাগিয়ে তার সঠিক পরিচর্যা করলে— জল, সার, সূর্যালোক প্রভৃতি পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে প্রকৃতির নিয়মেই তা নিজস্ব গতিতে বেড়ে ওঠে। জোর করে টেনে চারাটিকে বড় করা যায় না। তেমনি, মানুষের জীবনও একটি স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলে। অপরিকল্পিতভাবে বেশি তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে গেলে তাতে কোনো লাভ হয় না। সাফল্য হলো সারা বছরের প্রস্তুতির ফল। পরীক্ষার দিন সকালে অ্যাডমিট কার্ড প্রিন্ট করার জন্য কোথায় দোকান খোলা আছে খুঁজতে গেলে পরীক্ষায় না বসতে পারার সম্ভাবনাই বেশি। দূরদর্শিতা ও অধ্যবসায়ের সাথে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারলেই যথাসময়ে সাফল্য পাওয়া যেতে পারে। আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তার পুনরাবৃত্তি যাতে ভবিষ্যতে আর না হয়, তার জন্য নিজেকে সংশোধন করা প্রয়োজন এবং জীবনের কোনো পদক্ষেপই যাতে বিফলে না যায়, সেই দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। সেই জন্য সময় থাকতেই সঠিক লক্ষ্য স্থির করে প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে যথাসময়ে তার সুফল পাওয়া যায় এবং পরিকল্পনার অভাবে কোনো কাজ করতে গিয়ে যেন সময় ফুরিয়ে না যায়।

    খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পটা আমরা সবাই জানি। খরগোশ মাঝপথে ঘুমিয়ে পড়ার ফলে কচ্ছপ দৌড় প্রতিযোগিতায় জিতে যায়। কিন্তু খরগোশ ঘুমিয়ে না পড়লে হেরে যাবার কথা ছিল না। কেননা ০.১ কিমি/ঘণ্টায় দৌড়লে কচ্ছপের সবার পিছনেই থাকার কথা। ৩-৬ কিমি/ঘণ্টায় দৌড়ে একটি বিড়ালও তার আগে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। কিন্তু তাই বলে বিড়াল বাঘের সঙ্গে পারবে না কেননা ৫-১০ কিমি/ঘণ্টায় দৌড়ে (স্বল্প দূরত্বে তার গতিবেগ ৪০ থেকে ৫০ কিমি/ঘন্টা বা আরো বেশি) বাঘ বিড়ালকে হারিয়ে দেবে। অন্যদিকে হাতির বিশাল আকার তাকে ক্লান্ত না হয়ে দক্ষতার সাথে ১০-১৫ কিমি/ঘণ্টায় দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে সাহায্য করে যেখানে স্প্রিন্টাররা (বিড়াল/ বাঘ) তাদের সর্বোচ্চ গতি থাকা সত্ত্বেও ৫ কিলোমিটারের মতো দূরত্বের ইভেন্টে সহনশীলতার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। একটা বন্য খরগোশোর গতি দীর্ঘ দূরত্বের জন্য প্রায় একই। কিন্তু স্বল্প দূরত্বে এরা আরও তাড়াতাড়ি দৌড়তে পারে। তবুও সে সবার প্রথম হতে পারবে না কেননা দলের মধ্যে আসল দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়বিদ হল উচ্চ সহনশীল (Stamina) জাতের কুকুর। তার গতিবেগ ২০-২৫ কিমি/ঘণ্টা এবং এরা দীর্ঘ দূরত্বে একটানা দৌড়ে সবার প্রথম হবার যোগ্য। কিন্তু এই দলের বাইরে সব থেকে দ্রুতগতি সম্পন্ন প্রাণী হলো পেরেগ্রিন শাহিন (Peregrine Falcon) পাখি। এটি শিকারের জন্য উপর থেকে নিচের দিকে নামার (ডাইভ) সময় ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার (বা তারও বেশি, কখনো কখনো ৩৮৯ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত) বেগে উড়তে পারে। তবে বিভিন্ন শ্রেণিতে দ্রুততম প্রাণীর নাম ভিন্ন- স্থলচর প্রাণী (চারপেয়ে): চিতাবাঘ (Cheetah), যা ঘণ্টায় প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। জলজ প্রাণী: ব্ল্যাক মার্লিন (Black Marlin) বা সেইলফিশ (Sailfish), যা ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগে সাঁতার কাটতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

আইনের শাসন

সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অন্যায়, অপরাধ, দুবৃত্তায়ন, অবিচার, অঘটন, অনিয়ম, মাফিয়াতন্ত্র দুর্নীতি - এসবের অধিকাংশই সময়মতো প্রতিহত করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী আইনের দ্বারস্থ হলেও যথাযথ প্রমাণ বা সদিচ্ছার অভাবে অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। পেশিশক্তি, ক্ষমতার দম্ভ এবং টাকার জোরে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করেও যে কেউ সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল নাগরিক সমাজের নিশ্চুপতা। অন্যের ঘরে চুরি হলেও আমার তাতে কিছু যায় আসে না এমন মানসিকতার ফলে প্রতিবেশীও বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায় না। এই ঘটনা যে নিজের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে ঘটতে পারে, সেই চিন্তা হয়তো কেউ করে না। কেউ কেউ হয়তো নিজের মতামত প্রকাশের অধিকারটাই হারিয়ে ফেলেছে অথবা সঠিকভাবে নিজের বক্তব্য জনসমক্ষে উত্থাপন করতে পারছে না। বরং যা কিছু দেখা ও শোনা যায় তার একটা অংশ অর্ধসত্য, মনগড়া, ভুল তথ্য বা উল্টো কথা। বাস্তবে ঘটনাটা কি ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ সহজে পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী কী বললেন, অভিযোগ পাওয়ার পরেও পুলিশ কেন যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করল না, রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই বা কেন প্রশ্ন করা হল না? চুরি করা টাকার ভাগ চোর ছাড়া আর কার কার পকেটে গেল? বাকিরা তাতে নীরব কেন? চোরকে কি জিজ্ঞেস করা হয় না যে সে কেন চুরি করেসে কি নিজের ইচ্ছায় নাকি কারো নির্দেশে এই কাজ করল? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে আর যেন সেই ভুল না হয়, সেটা সকলেরই দেখা উচিত। যে সমাজে অর্থোপার্জনই চরম লক্ষ্য, সেখানে যে কোনো সুযোগ পেলে সকলেই তা কাজে লাগাতে চায়। সেই ক্ষেত্রে ঠিক-বেঠিক বা কর্মের পরিণতি কি হবে, তা নিয়ে যারা মাথা ঘামায় না, তারাই সহজে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ঝড়বৃষ্টি আসার আগেই বাড়িঘর মেরামত করে নিতে হয়, যাতে বর্ষাকালে তা ভেঙ্গে না পড়ে। সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এই সব দুর্নীতি ও অপরাধকে যথাসময়ে প্রতিহত না করে উল্টো সমর্থন বা সুযোগ করে দিলে ভুল হবে।

সব বাগানেই আগাছা জন্মায়, সেটা নিয়মিত ভাবে পরিষ্কার করতে না পারলে একসময় বাগান আর বাগান থাকে না - জঙ্গলে পর্যবসিত হয়। সিস্টেম ও আইন ব্যবস্থার প্রয়োগে ফাঁক আছে বলেই অপরাধ করেও অনেকে খুব সহজেই রেহাই পেয়ে যায়। প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বলেই যে কোনো রকম অঘটন সময় মতো প্রতিহত করা যায় না। প্রশ্রয় পেতে পেতে ক্ষুদ্র অপরাধীও হাতির পিঠে চড়া পিঁপড়ের মতো দুঃসাহসী হয়ে ওঠে, মশারাও হয়ে ওঠে ভয়ংকর। বংশবিস্তার করতে করতে এরা সংখ্যায় এখন মানুষের চেয়েও বেশি। তথাপি মনুষ্য প্রজাতি তাতে বিপন্ন নয় বলেই হয়তো এরা ততটা গুরুত্ব পায় না। যতই কামড়াক না কেন, না মেরে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানোর মতোই অস্বীকার বা উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে আমাদের ঘরেই যে চোরের বসবাস, তা আমরা কেউই মানতে রাজি হই না। প্রশ্ন হল - যাদের ছেলেমেয়েরা আজকের দিনে চোর-ডাকাত-মাফিয়া বা অন্য কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পিতামাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা এতদিন তাহলে তাদের কি শিক্ষা দিয়েছিলেন? সিলেবাস বহির্ভূত এতকিছু এরা জানল কি করে? হয়তো মানুষের মতো মানুষ হবার শিক্ষাটাই এরা কোনোকালে পায়নি। কেননা অতিচালাকের কি পরিণতি হয়, তা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। সৎ মানুষ মাত্রেই নির্বোধ এবং চতুরতাই সাফল্যের মাপকাঠি এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে সমাজের একটা অংশ খুব সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হয়, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব আগে পরে সকলকেই ভোগ করতে হয়। এর থেকে রেহাই পেতে সময় থাকতে থাকতেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সমস্যা জটিল অঙ্কের মতোই, সঠিক সমাধানে পৌঁছানোর সদিচ্ছা না থাকলে তা অমীমাংসিতই থেকে যায়। সমাজে অপরাধ নামক সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সময়মতো, সঠিকভাবে ও সহজে বিচার নিশ্চিত করতে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

তিনটি অতি পরিচিত প্রবাদের সারকথা

অহংকার পতনের মূল             অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সবার চেয়ে বড় এবং অভ্রান্ত মনে করে। এই অতি-আত্মবিশ্বাসের ফলে সে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখতে পা...