সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অন্যায়, অপরাধ, দুবৃত্তায়ন, অবিচার, অঘটন, অনিয়ম, মাফিয়াতন্ত্র ও দুর্নীতি - এসবের অধিকাংশই সময়মতো প্রতিহত করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী আইনের দ্বারস্থ হলেও যথাযথ প্রমাণ বা সদিচ্ছার অভাবে অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। পেশিশক্তি, ক্ষমতার দম্ভ এবং টাকার জোরে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করেও যে কেউ সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল নাগরিক সমাজের নিশ্চুপতা। অন্যের ঘরে চুরি হলেও আমার তাতে কিছু যায় আসে না — এমন মানসিকতার ফলে প্রতিবেশীও বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায় না। এই ঘটনা যে নিজের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে ঘটতে পারে, সেই চিন্তা হয়তো কেউ করে না। কেউ কেউ হয়তো নিজের মতামত প্রকাশের অধিকারটাই হারিয়ে ফেলেছে অথবা সঠিকভাবে নিজের বক্তব্য জনসমক্ষে উত্থাপন করতে পারছে না। বরং যা কিছু দেখা ও শোনা যায় তার একটা অংশ অর্ধসত্য, মনগড়া, ভুল তথ্য বা উল্টো কথা। বাস্তবে ঘটনাটা কি ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ সহজে পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী কী বললেন, অভিযোগ পাওয়ার পরেও পুলিশ কেন যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করল না, রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই বা কেন প্রশ্ন করা হল না? চুরি করা টাকার ভাগ চোর ছাড়া আর কার কার পকেটে গেল? বাকিরা তাতে নীরব কেন? চোরকে কি জিজ্ঞেস করা হয় না যে সে কেন চুরি করে—সে কি নিজের ইচ্ছায় নাকি কারো নির্দেশে এই কাজ করল? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে আর যেন সেই ভুল না হয়, সেটা সকলেরই দেখা উচিত। যে সমাজে অর্থোপার্জনই চরম লক্ষ্য, সেখানে যে কোনো সুযোগ পেলে সকলেই তা কাজে লাগাতে চায়। সেই ক্ষেত্রে ঠিক-বেঠিক বা কর্মের পরিণতি কি হবে, তা নিয়ে যারা মাথা ঘামায় না, তারাই সহজে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ঝড়বৃষ্টি আসার আগেই বাড়িঘর মেরামত করে নিতে হয়, যাতে বর্ষাকালে তা ভেঙ্গে না পড়ে। সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এই সব দুর্নীতি ও অপরাধকে যথাসময়ে প্রতিহত না করে উল্টো সমর্থন বা সুযোগ করে দিলে ভুল হবে।
সব বাগানেই আগাছা জন্মায়, সেটা নিয়মিত ভাবে পরিষ্কার করতে না পারলে একসময় বাগান আর বাগান থাকে না - জঙ্গলে পর্যবসিত হয়। সিস্টেম ও আইন ব্যবস্থার প্রয়োগে ফাঁক আছে বলেই অপরাধ করেও অনেকে খুব সহজেই রেহাই পেয়ে যায়। প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বলেই যে কোনো রকম অঘটন সময় মতো প্রতিহত করা যায় না। প্রশ্রয় পেতে পেতে ক্ষুদ্র অপরাধীও হাতির পিঠে চড়া পিঁপড়ের মতো দুঃসাহসী হয়ে ওঠে, মশারাও হয়ে ওঠে ভয়ংকর। বংশবিস্তার করতে করতে এরা সংখ্যায় এখন মানুষের চেয়েও বেশি। তথাপি মনুষ্য প্রজাতি তাতে বিপন্ন নয় বলেই হয়তো এরা ততটা গুরুত্ব পায় না। যতই কামড়াক না কেন, না মেরে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানোর মতোই অস্বীকার বা উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে আমাদের ঘরেই যে চোরের বসবাস, তা আমরা কেউই মানতে রাজি হই না। প্রশ্ন হল - যাদের ছেলেমেয়েরা আজকের দিনে চোর-ডাকাত-মাফিয়া বা অন্য কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পিতামাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা এতদিন তাহলে তাদের কি শিক্ষা দিয়েছিলেন? সিলেবাস বহির্ভূত এতকিছু এরা জানল কি করে? হয়তো মানুষের মতো মানুষ হবার শিক্ষাটাই এরা কোনোকালে পায়নি। কেননা অতিচালাকের কি পরিণতি হয়, তা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। সৎ মানুষ মাত্রেই নির্বোধ এবং চতুরতাই সাফল্যের মাপকাঠি — এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে সমাজের একটা অংশ খুব সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হয়, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব আগে পরে সকলকেই ভোগ করতে হয়। এর থেকে রেহাই পেতে সময় থাকতে থাকতেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সমস্যা জটিল অঙ্কের মতোই, সঠিক সমাধানে পৌঁছানোর সদিচ্ছা না থাকলে তা অমীমাংসিতই থেকে যায়। সমাজে অপরাধ নামক সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সময়মতো, সঠিকভাবে ও সহজে বিচার নিশ্চিত করতে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন