শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ও আত্মনির্ভর ভারতের পথচলা

বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা ভারতের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সামনে এক গভীর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেইসরায়েল-ইরান সংঘাত এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পণ্য পরিবহনে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় ভারতের আমদানি বাণিজ্য ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেএই সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর স্বপ্ন কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এক অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে

ভারত বর্তমানে তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫-৯০% বিদেশ থেকে আমদানি করেযুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় সম্প্রতি দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছেএর প্রভাবে কলকাতায় পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১০৮.৭০ টাকায় পৌঁছেছেশুধু জ্বালানি নয়, ভারত সার ও ভোজ্য তেলের (চাহিদার প্রায় ৬০%) জন্যও বিদেশের ওপর নির্ভরশীল

ভারতের সংবাদশিল্পও বর্তমানে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সংকটের মুখে

  • দেশের বার্ষিক নিউজপ্রিন্টের চাহিদা প্রায়১২ লক্ষ টন, যার মধ্যে দেশীয় উৎপাদন মাত্র ৫ লক্ষ টন
  • চাহিদার প্রায় ৬০% নিউজপ্রিন্ট কানাডা, রাশিয়া, জার্মানি এবং আমেরিকার মতো দেশ থেকে আমদানি করতে হয়
  • যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শিপিং খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাগজের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা ছোট ও মাঝারি সংবাদপত্রের অস্তিত্ব বিপন্ন করছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় মিলগুলির আধুনিকীকরণ এবং বাঁশ ও পুনর্ব্যবহৃত কাগজের পাল্প ব্যবহারের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া জরুরি

২০২৬ সাল ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর হতে চলেছে'মেক ইন ইন্ডিয়া' প্রকল্পের আওতায় তেজস বিমান, দেশীয় যুদ্ধবিমান (TEDBF) এবং ঘাতক সাবমেরিন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছেপাশাপাশি, সেমিকন্ডাক্টরের আমদানিনির্ভরতা কমাতে 'ভারত সেমিকন্ডাক্টর মিশন'-এর অধীনে উত্তরপ্রদেশে এইচসিএল ও ফক্সকন চিপ তৈরির কারখানা স্থাপন করছে 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানেই কৌশলগত দুর্বলতাভারত যদি আমদানির তালিকা ছোট করে দেশীয় উৎপাদনের চাকা সচল করতে পারে, তবেই এই ভূ-রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষায় সফল হয়ে 'বিশ্ববন্ধু' হিসেবে প্রকৃত অর্থে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে

আংশিক সত্যের বিভ্রম ও সুবিবেচনার পথ

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক উপলব্ধির অভাব রয়েছে। প্রতিনিয়ত আমরা সামাজিক মাধ্যম বা আলাপচারিতায় এমন অনেক তথ্য পাই যা শুনতে সত্য মনে হলেও আসলে তা আংশিক সত্য। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি ডাহা মিথ্যার চেয়ে একটি 'অর্ধ-সত্য' (Half-truth) অনেক বেশি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। আর এই বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে যেকোনো ঘটনার ভালো এবং মন্দউভয় দিক বা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ খতিয়ে দেখা বর্তমান সময়ে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণত 'মিথ্যা' বলতে আমরা বুঝি যা সম্পূর্ণ অবাস্তব বা বানোয়াট। একে সহজেই প্রমাণ দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা যায়। কিন্তু 'অর্ধ-সত্য' হলো একটি সত্য তথ্যের খণ্ডিত রূপ। এখানে তথ্যটি সত্য হলেও তার পেছনের প্রেক্ষাপট বা পরিপ্রেক্ষিত (Context) সরিয়ে ফেলা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো বিজ্ঞাপন বলে একটি পানীয় "সম্পূর্ণ চর্বিমুক্ত", তবে সেটি সত্য হতে পারে। কিন্তু সেই পানীয়তে যদি প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, যা শরীরের জন্য সমান ক্ষতিকর, তবে সেই তথ্যটি গোপন রাখা একটি 'অর্ধ-সত্য'এখানে সত্যকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার হিসেবে।

যেকোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার ইতিবাচক (Pros) এবং নেতিবাচক (Cons) উভয় দিক বিচার করাকে বিশেষজ্ঞরা 'ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং' বা সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা বলছেন। এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  • সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ: কেবল সুবিধার দিকগুলো দেখলে মানুষ 'অপটিমিজম বায়াস' বা অতি-আশাবাদের শিকার হয়ফলে ঝুঁকির দিকগুলো নজর এড়িয়ে যায়উভয় দিক দেখলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়
  • ভুল ধারণা দূর করা: আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় নিজের বিশ্বাসের সপক্ষে তথ্য খোঁজেবিপক্ষ যুক্তি বা সীমাবদ্ধতাগুলো খতিয়ে দেখলে নিজের ভুলগুলো সংশোধন করার সুযোগ পাওয়া যায়
  • সহমর্মিতা সুসম্পর্ক: ব্যক্তিগত বা সামাজিক দ্বন্দ্বে প্রতিটি পক্ষই নিজের অবস্থানকে 'সত্য' বলে মনে করেঅন্য পক্ষের সীমাবদ্ধতা বা কারণগুলো বুঝলে বিবাদ মিটিয়ে ফেলা সহজ হয়

একটি অফিসের উদাহরণ দেওয়া যাকযদি বলা হয়, "একজন কর্মী গত তিন দিন ধরে কাজে দেরি করে আসছেন," তবে তা শুনে তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হতে পারেকিন্তু যদি জানা যায় যে, তার বাড়িতে কেউ গুরুতর অসুস্থ এবং তিনি সারা রাত সেবা করে ভোরে অফিসে আসছেন, তবে সম্পূর্ণ চিত্রটি বদলে যায়প্রথম তথ্যটি 'অর্ধ-সত্য' আর দ্বিতীয়টি হলো 'সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট'

কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত— "আমি কি মুদ্রার উল্টো পিঠটি দেখেছি?" কোনো তথ্য বা ঘটনাকে কেবল সাদাকালো চশমায় না দেখে তার ধূসর এলাকাগুলো অর্থাৎ সুবিধা অসুবিধাগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার করাই বুদ্ধিমানের কাজ

আগরতলার মতো শহরে কোনো নতুন বড় পরিকাঠামো তৈরির সময় আমরা কেবল তার ভবিষ্যৎ সুবিধার কথা শুনি, কিন্তু নির্মাণের সময়কার জনদুর্ভোগ বা পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থাকেপ্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন আমরা এই উভয় দিক বিবেচনা করে পরিকল্পনা করি মনে রাখা প্রয়োজন, সত্য কেবল তথ্যে থাকে না, সত্য থাকে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটে

বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

উত্তম বনাম অধম: নিজের মহত্ত্ব বজায় রাখার দর্শন

"তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?" - এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস 'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬) এর একটি অবিস্মরণীয় উক্তি এই উক্তিটি মূলত মানুষের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বআত্মসম্মান এবং অন্যের খারাপ আচরণের বিপরীতে নিজের সৎ ও মানবিক সত্তা বজায় রাখার অটল মানসিকতাকে তুলে ধরে   অন্যের অন্যায়, অমানবিক ও অশুভ আচরণ কখনোই আমাদের অনুকরণীয় হতে পারে না উপন্যাসে, নাবিকরা নবকুমারকে একটি নির্জন দ্বীপে ফেলে চলে গেলে, নবকুমার তাদের অধম আচরণ দেখেও, নিজের উত্তম মানসিকতা থেকে তাদের জন্য খাবার ও পানীয় জলের খোঁজ করেছিলেন

সংক্ষেপে, এটি একটি আত্মসংশোধনের  নৈতিকতার আহ্বান, যা মানুষকে অন্যের দোষ দেখে নিজের সংশোধন করতে শেখায় বর্তমান সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই কালজয়ী উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি আমাদের ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের একটি ধ্রুব সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা প্রায়ই অন্যের সাফল্য বা খারাপ আচরণ দেখে প্রভাবিত হইএই উক্তিটি আমাদের শেখায় যে, অন্য কেউ যদি অসৎ বা হীন হয়, তবে তাকে অনুসরণ করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়নিজের আদর্শে অটল থাকাই প্রকৃত ব্যক্তিত্বের পরিচয়সমাজে দুর্নীতি বা অনৈতিকতা যখন সাধারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনেকে ভাবেন "সবাই তো করছে, আমি করলে ক্ষতি কী?" এই উক্তিটি সেই গা ভাসিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে রুখে দেয়এটি আমাদের নিজের বিবেক ও মনুষ্যত্বকে জাগ্রত রাখতে উদ্বুদ্ধ করেসম্পর্কের টানাপোড়েনে অনেক সময় মানুষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে"সে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাই আমিও করব"এই প্রতিহিংসামূলক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আভিজাত্য ও মহত্ত্ব বজায় রাখার শিক্ষা দেয় এই উক্তিবর্তমানের বিশৃঙ্খলা বা 'নৈরাজ্যের' সময়ে সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব কেবল অন্যের ওপর না চাপিয়ে নিজের থেকেই শুরু করার ডাক দেয় এই দর্শনপাঁচজন ভুল করলেও নিজের সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজকে উত্তমের পথে নেওয়া সম্ভবসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোলিং বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের ভিড়ে অনেকে নিজের ভাষা ও রুচি হারিয়ে ফেলেনসেখানেও এই উক্তিটি মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশ কলুষিত হলেও নিজের রুচি ও শালীনতা বজায় রাখা আমাদের নিজেদেরই দায়িত্ব অন্যের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের উত্তরে নিজে শালীন থাকাটাই হলো প্রকৃত আভিজাত্য "সবাই করছে, তাই আমিও করছি"এই সাধারণ প্রবণতা বা 'গা ভাসিয়ে দেওয়া' আসলে ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয়। সংক্ষেপে, এটি কেবল একটি সাহিত্যিক উক্তি নয়, বরং একটি জীবনদর্শন যা মানুষকে কোনো পরিস্থিতিতেই নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন না দিতে উৎসাহিত করে

পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ও আত্মনির্ভর ভারতের পথচলা

বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা ভারতের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সামনে এক গভীর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে । ইস...