"তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?" - এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস 'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬) এর একটি অবিস্মরণীয় উক্তি। এই উক্তিটি মূলত মানুষের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব, আত্মসম্মান এবং অন্যের খারাপ আচরণের বিপরীতে নিজের সৎ ও মানবিক সত্তা বজায় রাখার অটল মানসিকতাকে তুলে ধরে। অন্যের অন্যায়, অমানবিক ও অশুভ আচরণ কখনোই আমাদের অনুকরণীয় হতে পারে না। উপন্যাসে, নাবিকরা নবকুমারকে একটি নির্জন দ্বীপে ফেলে চলে গেলে, নবকুমার তাদের অধম আচরণ দেখেও, নিজের উত্তম মানসিকতা থেকে তাদের জন্য খাবার ও পানীয় জলের খোঁজ করেছিলেন।
সংক্ষেপে, এটি একটি আত্মসংশোধনের ও নৈতিকতার আহ্বান, যা মানুষকে অন্যের দোষ দেখে নিজের সংশোধন করতে শেখায়। বর্তমান সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই কালজয়ী উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি আমাদের ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের একটি ধ্রুব সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা প্রায়ই অন্যের সাফল্য বা খারাপ আচরণ দেখে প্রভাবিত হই। এই উক্তিটি আমাদের শেখায় যে, অন্য কেউ যদি অসৎ বা হীন হয়, তবে তাকে অনুসরণ করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। নিজের আদর্শে অটল থাকাই প্রকৃত ব্যক্তিত্বের পরিচয়। সমাজে দুর্নীতি বা অনৈতিকতা যখন সাধারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনেকে ভাবেন "সবাই তো করছে, আমি করলে ক্ষতি কী?" এই উক্তিটি সেই গা ভাসিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে রুখে দেয়। এটি আমাদের নিজের বিবেক ও মনুষ্যত্বকে জাগ্রত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে অনেক সময় মানুষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। "সে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাই আমিও করব"—এই প্রতিহিংসামূলক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আভিজাত্য ও মহত্ত্ব বজায় রাখার শিক্ষা দেয় এই উক্তি। বর্তমানের বিশৃঙ্খলা বা 'নৈরাজ্যের' সময়ে সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব কেবল অন্যের ওপর না চাপিয়ে নিজের থেকেই শুরু করার ডাক দেয় এই দর্শন। পাঁচজন ভুল করলেও নিজের সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজকে উত্তমের পথে নেওয়া সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোলিং বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের ভিড়ে অনেকে নিজের ভাষা ও রুচি হারিয়ে ফেলেন। সেখানেও এই উক্তিটি মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশ কলুষিত হলেও নিজের রুচি ও শালীনতা বজায় রাখা আমাদের নিজেদেরই দায়িত্ব। অন্যের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের উত্তরে নিজে শালীন থাকাটাই হলো প্রকৃত আভিজাত্য। "সবাই করছে, তাই আমিও করছি"—এই সাধারণ প্রবণতা বা 'গা ভাসিয়ে দেওয়া' আসলে ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয়। সংক্ষেপে, এটি কেবল একটি সাহিত্যিক উক্তি নয়, বরং একটি জীবনদর্শন যা মানুষকে কোনো পরিস্থিতিতেই নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন না দিতে উৎসাহিত করে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন