মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

আইনের শাসন

সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অন্যায়, অপরাধ, দুবৃত্তায়ন, অবিচার, অঘটন, অনিয়ম, মাফিয়াতন্ত্র দুর্নীতি - এসবের অধিকাংশই সময়মতো প্রতিহত করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী আইনের দ্বারস্থ হলেও যথাযথ প্রমাণ বা সদিচ্ছার অভাবে অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। পেশিশক্তি, ক্ষমতার দম্ভ এবং টাকার জোরে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করেও যে কেউ সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল নাগরিক সমাজের নিশ্চুপতা। অন্যের ঘরে চুরি হলেও আমার তাতে কিছু যায় আসে না এমন মানসিকতার ফলে প্রতিবেশীও বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায় না। এই ঘটনা যে নিজের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে ঘটতে পারে, সেই চিন্তা হয়তো কেউ করে না। কেউ কেউ হয়তো নিজের মতামত প্রকাশের অধিকারটাই হারিয়ে ফেলেছে অথবা সঠিকভাবে নিজের বক্তব্য জনসমক্ষে উত্থাপন করতে পারছে না। বরং যা কিছু দেখা ও শোনা যায় তার একটা অংশ অর্ধসত্য, মনগড়া, ভুল তথ্য বা উল্টো কথা। বাস্তবে ঘটনাটা কি ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ সহজে পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী কী বললেন, অভিযোগ পাওয়ার পরেও পুলিশ কেন যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করল না, রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই বা কেন প্রশ্ন করা হল না? চুরি করা টাকার ভাগ চোর ছাড়া আর কার কার পকেটে গেল? বাকিরা তাতে নীরব কেন? চোরকে কি জিজ্ঞেস করা হয় না যে সে কেন চুরি করেসে কি নিজের ইচ্ছায় নাকি কারো নির্দেশে এই কাজ করল? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে আর যেন সেই ভুল না হয়, সেটা সকলেরই দেখা উচিত। যে সমাজে অর্থোপার্জনই চরম লক্ষ্য, সেখানে যে কোনো সুযোগ পেলে সকলেই তা কাজে লাগাতে চায়। সেই ক্ষেত্রে ঠিক-বেঠিক বা কর্মের পরিণতি কি হবে, তা নিয়ে যারা মাথা ঘামায় না, তারাই সহজে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ঝড়বৃষ্টি আসার আগেই বাড়িঘর মেরামত করে নিতে হয়, যাতে বর্ষাকালে তা ভেঙ্গে না পড়ে। সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এই সব দুর্নীতি ও অপরাধকে যথাসময়ে প্রতিহত না করে উল্টো সমর্থন বা সুযোগ করে দিলে ভুল হবে।

সব বাগানেই আগাছা জন্মায়, সেটা নিয়মিত ভাবে পরিষ্কার করতে না পারলে একসময় বাগান আর বাগান থাকে না - জঙ্গলে পর্যবসিত হয়। সিস্টেম ও আইন ব্যবস্থার প্রয়োগে ফাঁক আছে বলেই অপরাধ করেও অনেকে খুব সহজেই রেহাই পেয়ে যায়। প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বলেই যে কোনো রকম অঘটন সময় মতো প্রতিহত করা যায় না। প্রশ্রয় পেতে পেতে ক্ষুদ্র অপরাধীও হাতির পিঠে চড়া পিঁপড়ের মতো দুঃসাহসী হয়ে ওঠে, মশারাও হয়ে ওঠে ভয়ংকর। বংশবিস্তার করতে করতে এরা সংখ্যায় এখন মানুষের চেয়েও বেশি। তথাপি মনুষ্য প্রজাতি তাতে বিপন্ন নয় বলেই হয়তো এরা ততটা গুরুত্ব পায় না। যতই কামড়াক না কেন, না মেরে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানোর মতোই অস্বীকার বা উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে আমাদের ঘরেই যে চোরের বসবাস, তা আমরা কেউই মানতে রাজি হই না। প্রশ্ন হল - যাদের ছেলেমেয়েরা আজকের দিনে চোর-ডাকাত-মাফিয়া বা অন্য কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পিতামাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা এতদিন তাহলে তাদের কি শিক্ষা দিয়েছিলেন? সিলেবাস বহির্ভূত এতকিছু এরা জানল কি করে? হয়তো মানুষের মতো মানুষ হবার শিক্ষাটাই এরা কোনোকালে পায়নি। কেননা অতিচালাকের কি পরিণতি হয়, তা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। সৎ মানুষ মাত্রেই নির্বোধ এবং চতুরতাই সাফল্যের মাপকাঠি এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে সমাজের একটা অংশ খুব সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হয়, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব আগে পরে সকলকেই ভোগ করতে হয়। এর থেকে রেহাই পেতে সময় থাকতে থাকতেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সমস্যা জটিল অঙ্কের মতোই, সঠিক সমাধানে পৌঁছানোর সদিচ্ছা না থাকলে তা অমীমাংসিতই থেকে যায়। সমাজে অপরাধ নামক সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সময়মতো, সঠিকভাবে ও সহজে বিচার নিশ্চিত করতে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫

সঠিক পথের সন্ধানে

দূরদর্শিতা এবং বিবেকবুদ্ধি ছাড়া জীবনে সঠিক পথ বেছে নেওয়া বা সময়ে সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন। অনিচ্ছাকৃত বা স্বেচ্ছাকৃত ভুল করাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু জীবনে ভালো কিছু করতে গেলে ঠিক সেটাই করতে হয়তাতেই নিজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব। আমাদের জীবনে এবং সমাজে সমস্যার কোনো শেষ নেই। সমস্যার প্রকৃত সমাধান খুঁজতে গেলে সমস্যাটা আসলে কি, সেটাই আগে ভালোভাবে বোঝা দরকার। সঠিক রোগনির্ণয় করতে না পারলে সফলভাবে চিকিৎসা করা যায় না। তেমনি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে জীবনে সঠিক পথটাই বেছে নিতে হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যটাই যদি ভুল হয় তবে নিরুদ্দেশ হবার সম্ভাবনাই বেশি। মূর্খ ব্যক্তি নিজের ক্ষতি করে, চালাক ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি সাধন করে, আর বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের উন্নতির সাথে সাথে সবার মঙ্গল নিশ্চিত করে। যদিও স্বার্থপর যারা তারা নিজের স্বার্থসিদ্ধির কথাই বেশি চিন্তা করে, তাতে অন্যের কোনও উপকার নাও হতে পারে। নির্বুদ্ধিতা এবং লোভের সমন্বয়ে মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভাগ্য। বাস্তব-বুদ্ধির অভাবে অনেকেই সৎ হওয়া সত্ত্বেও ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, যার ফলস্বরূপ জীবনে ব্যর্থতা আসে। নিজ নিজ দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায়বদ্ধতার স্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলে কি করতে হবে বা কি করা উচিত নয়, সেই সম্বন্ধে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। 

জীবনে সফল হতে হলে নিজের পথ নিজেকেই বেছে নিতে হয়, যাতে কিনা অন্যকে পরে দোষারোপ করার কোন অবকাশ না থাকে। নিজের সব ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার নিজেকেই নিতে হবে এবং যথা সময়ে তা সংশোধন করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সেটা দেখা উচিত। সাফল্য একদিনে আসে না। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যাতে ভবিষ্যতের ভিতকে শক্তিশালী করতে পারে, সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। আলোর অনুপস্থিতিই হল অন্ধকার। অন্ধকারের সমালোচনা না করে, আলো জ্বালানোই তার একমাত্র প্রতিকার। দিশাহীন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেলেই নিরুদ্দেশ হতে হয়তাই জীবনে একটি সঠিক উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে, সময়োপযোগী যথাযথ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা উচিত, যাতে যথাসময়ে অভীষ্ট ফল লাভ করা যায় । সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে শেষবেলায় আর কিছুই করার থাকে না। জন্ম-মৃত্যু কারো নিজের হাতে নেই, আয়ু ফুরিয়ে গেলে যত টাকাই জমানো থাকুক না কেন, তা কোনো কাজে আসে না। দুনিয়াটা একটা নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিস্তারের কাছে মানুষের অস্তিত্ব নগণ্য, কিন্তু মানুষের এই সামান্য জীবন শুধু মাত্র বিবেক-বুদ্ধির জোরেই মহার্ঘ হয়ে উঠতে পারেযা আমাদের হাতে নেই, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ সরিয়ে আশার আলো নিয়ে আসে। জীবনের অবশিষ্ট পথে যেন আমরা নিজ নিজ দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা পালনের মাধ্যমে সবাইকে সাথে নিয়ে একসাথে এগিয়ে যেতে পারি এই লক্ষ্যেই আমাদের ব্রতী হওয়া কাম্য।

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

একটি চোরের গল্প

একদিন এক চোর চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে পাশের গ্রামের একটি বনেদি বাড়িতে গেল। গিয়ে দেখল বাড়ির ষন্ডামার্কা দারোয়ান নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। তাকে বিরক্ত না করে সোজা চলে গেল ঘরের সামনে। গিয়ে দেখল যে দরজা-জানালা সব খোলা রেখেই বাড়ির মালিক কোথাও গেছেন। হয়তবা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, তাই দরজা-জানালা বন্ধ করারও সময় পাননি। ঘরে ঢুকে চুরি করতে গিয়ে টাকা-পয়সা তেমন কিছুই সে খুঁজে পেল না। কিন্তু অন্য যা কিছু দামি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব সবকিছু সে বস্তায় ভরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। যাবার পথে দেখতে পেল একজন পুলিশ বাইক চালিয়ে আসছে। চোরকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছ?” চোর বলল, “স্যার, আমাদের অনেক কষ্ট। চুরি করাটাই আমাদের পেশা। আর আপনি তো জানেন স্যার যে কর্মই ধর্ম, তাই আমি নিজ ধর্ম পালন করছি। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে টাকাপয়সা তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। আমি আমার আগের চুরি করা টাকা থেকে কিছু নিয়ে এসেছিলাম। এটা আপনি রাখেন।”

পুলিশ বলল, “সে তো ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের ধর্মও তো আমাদের পালন করতে হবে। বাড়িওয়ালা কমপ্লেইন করলে তোকে খুঁজতে আমরা তোর বাড়িতে যাব। তোকে যেন এই এলাকায় কয়েক মাস আর না দেখতে পাই।”

চোর সবিনয়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার।”

যাবার পথে কি মনে হতে নিজের ভুয়া সিমের মোবাইল বের করে পত্রিকা অফিসে ফোন করল। ফোনের ওপার থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, “হ্যালো, কে বলছেন?” চোর বলল, “আমাকে আপনি চিনবেন না। কিন্তু একটা খবর আছে। চুরি হয়েছে। সেটা জানাতেই ফোন করলাম। কিন্তু একটাই অনুরোধ, আমার পরিচয় গোপন রাখবেন।” বলে চোর কখন, কীভাবে, কোথায় চুরি করেছে তার সব বৃত্তান্ত দিয়ে দিল। ফোনে কথা শেষ হতে না হতেই কিছু লোক তাকে ঘিরে ধরল। সঙ্গের জিনিসপত্র কোথা থেকে পেয়েছে জানতে চাইলে চোর তার সদুত্তর দিতে পারল না। চোর সন্দেহে লোকগুলো তাকে বেদম পেটাতে লাগল এবং পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিল। পরদিন সকালে পত্রিকায় বাড়ির মালিকের ছবিসহ চুরির খবরটি প্রকাশিত হল এবং সাথে জনগণকে এটাও বুঝিয়ে বলা হল যে কারোরই আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। কেননা আইন আইনের পথে চলবে। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।

কয়েকদিন সব ঠিকঠাক চলল। বাড়ির মালিক নিজের চুরি যাওয়া জিনিসপত্রের অধিকাংশই ফেরত পেয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ-প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই চোর খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে গেল। সেই খবর আর কোথাও প্রকাশিত হল না। চোরও কিছুদিন চুপচাপ থেকে তারপর আবার চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করল। কিন্তু এইবার আর চুরি করার সময় মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে যাবে না বলেই মনস্থির করল। বেশি দূর না গিয়ে চুরি করতে একদিন সেই পাড়ারই এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে ঢুকে পড়ল। চুরি করার আগে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে বলে রান্নাঘরে কিছু খাবার আছে কিনা দেখতে গেল। দেখল যে মাংস-ভাত রান্না করা আছে, তাই খেতে লাগল। ততক্ষণে ব্যবসায়ী বাড়িতে ফিরে এসে চোরকে দেখে চিনতে পেরে গেলেন। খাবার চুরি করার জন্য তার বাড়িতে কেউ হানা দিতে পারে বলে তার ধারণা ছিল না। ধরা পড়ে গিয়ে চোর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল আর ক্ষমা চাইতে লাগল।

ব্যবসায়ী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই চুরি করিস কেন?” চোর বলল, “দাদা, আমার কোনো রোজগার নেই, জিনিস চুরি করে সেগুলি বিক্রি করে খাই।”

ব্যবসায়ী বললেন, “আমি তোকে পুলিশে দেব না, কিন্তু তুই এই চুরি করাটা বন্ধ কর। তার বদলে তোকে আমি জিনিস বেচারই কাজ দিচ্ছি। যত টাকার জিনিস বেচতে পারবি তার ১০% কমিশন তোর। মাসের শেষে সর্বমোট যত টাকার বিক্রি হবে তার উপর বোনাসও পাবি। বল রাজি আছিস কিনা?” চোর এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।

জিনিস বিক্রি করে ধীরে ধীরে তার লাভের পরিমাণ বাড়তে থাকল। অপরাধের জগৎ থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য সে ব্যবসায়ীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকল। তার নিজস্ব অর্থনৈতিক অবস্থার আরও উন্নতি হলে সে মাঝে মাঝেই তার অতীতের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার লক্ষ্যে সমাজের বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে যথাসম্ভব দান-দক্ষিণা করে একজন সুনাগরিক হিসাবে নিজের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা পালন করতে লাগল।

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

জনগণের সরকার

একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি তা আমি-আপনি না জানলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিকই জানে। প্রশ্ন করে দেখুন Gemeni, Chat GPT বা Grok-কে, “What are the duties and responsibilities of a Govt. employee in Tripura?” কি উত্তর দেয় দেখুন। উত্তরটা ঠিক না বেঠিক সেটা যাচাই করুন। এবং বাস্তবে একজন সরকারি কর্মচারী এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের কতটা সঠিকভাবে পালন করেন সেটা খোঁজ নিয়ে দেখুন। সরকারি কাজকর্ম একটা নির্দিষ্ট সিস্টেমে চলার কথা, কারো খেয়াল খুশি মতো নয়। কেননা administration এবং management শেখার বিষয়। কিন্তু এই বিষয়ে স্কুল কলেজে কতজন পড়াশোনা করেছে সেটা নিশ্চিত নয়। কেননা সাবজেক্টই ছিল না। সেই ক্ষেত্রে না জেনেবুঝে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশি। জনসম্পদ নিজের সম্পত্তি নয় এবং জনস্বার্থে কাজ করাটাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব এই ধারণা না থাকলে ভুল হতেই পারে। সরকার মানেই of the people, by the people, for the people. রাজা হলে সেটা ঠিক উলটো হবে। তখন প্রজারা সব কিছুই রাজার জন্য করবেন। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধি জনগণের জন্য কাজ করেন। যদিও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটা অংশ নিজেদের লাভ লোকসান নিয়েই অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন। তাই সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা দুর্নীতির জন্য কি কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আছে সেই-সম্বন্ধে সবার স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। দেখার কেউ না থাকলে চুরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সব রকম সরকারি কাজেই যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এই ব্যাপারে প্রশাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। দূরদর্শিতার অভাবে অনেক পরিকল্পনাই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না-ও হতে পারে। যথাসময়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই সব কিছু করা উচিত যাতে শেষ সময়ে হয়রানি না হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সময়োচিত পরিষেবা প্রদান, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার সাথে কাজ করার সাথে সাথে আর্থিক স্বনির্ভরতাই নির্বাচিত সরকারের অস্তিত্বের ভিত শক্তিশালী করতে পারে। সুশাসন নিশ্চিত করতে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আমাদের বর্তমান অবস্থান মূল্যায়ন করা আবশ্যক। ছোট মাঠে দুর্বল শটও ছয় হয়, কিন্তু বৃহৎ ক্ষেত্রে ওই একই শট বিপদের কারণ, অর্থাৎ আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শাসন (গভর্নেন্স), ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট), এবং প্রশাসন (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) হলো প্রশাসনিক পরিধির মূল স্তম্ভ। কার্যকর ও সময়োচিত নাগরিক পরিষেবা প্রদানের জন্য তাই সবার আগে প্রশাসনিক পরিকাঠামো, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, এবং সমস্ত কর্মপদ্ধতির মান উন্নত করতে হবে।

প্রকৃত শিক্ষার গুরুত্ব

যখন কোনো ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলে না, তখন সেটা অকেজো বলেই ধরা হয়। কিন্তু যখনই আপনার সামনের বাল্বটি জ্বলে উঠবে তখনই সেই আলোয় আপনাকে দেখা যাবে। আপনি দেখতে কেমন তখনই সেটা বোঝা যাবে। আপনাকে দেখতে যতই ভালো হোক না কেন, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনাকে দেখাই যাবে না। একজন শিক্ষক এবং ছাত্রের সম্পর্কটাও অনেকটা সেই রকম। শিক্ষক নিজে যতই জ্ঞানী হোন না কেন, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যদি বিবেক-বুদ্ধি-মেধা ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম না হন তবে সব প্রচেষ্টাই বৃথা। ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তব-জীবনে স্বাবলম্বী ও সফল হবার উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই পেশা হিসাবে শিক্ষকতার সার্থকতা। দেশের আগামী প্রজন্মকে মানুষ হিসেবে উন্নতি ও সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেওয়াই প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, “আমাদের শিক্ষার মধ্যে এমন একটি সম্পদ থাকা চাই যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না, সত্য দেয়; যা কেবল ইন্ধন দেয় না, অগ্নি দেয়।”
স্কুল-কলেজে যে যতটা পড়াশোনা করেছে তার ঠিক ততটাই জ্ঞান আছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে যখন কেউ এক লাইন বাংলা বা ইংরেজি সঠিকভাবে লিখতে পারে না, তখন এই প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্তঃসারশূন্য বলেই মনে হয়। উচ্চশিক্ষিত বলতে যা বোঝায় তাতে কতজন রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র বসু বা স্বামী বিবেকানন্দের মতো মেধা, ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার অধিকারী হতে পেরেছেন সেটা একটা বড় প্রশ্ন। বাস্তব জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অনেকেই সঠিক পথে চলতে গিয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে বিপথে পরিচালিত হয়। কেননা কি করে সঠিক পথে সফলভাবে চলতে হয় সেটাই হয়তোবা তাদের জানা নেই। অথবা নিজ নিজ সংকীর্ণ মানসিকতা, নির্বুদ্ধিতা ও বিবেক বোধের অভাবের ফলে খুব সহজেই তারা অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে যায় যা অনেক ক্ষেত্রেই সবার জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, প্রয়াত ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামের মতে, “মেধাবী হয়ে গর্ব করার কিছু নেই, কারণ শয়তানও কিন্তু মেধাবী হয়। মনুষ্যত্ব ও সততা না থাকলে সে মেধার কোন মূল্য নাই।”
মুখস্থবিদ্যা স্মৃতিশক্তির পরিচয় হলেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। যে জ্ঞান সারাজীবন কাজে লাগে এবং মানুষকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় সেটাই প্রকৃত জ্ঞান - যা আমাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়ে ওঠে। চাণক্যের মতে, “খাবার যতই দামি হোক - পচে গেলে যেমন তার কোন মূল্য থাকে না, ঠিক তেমনি শিক্ষা যতই থাকুক, মনুষ্যত্ব না থাকলে সেই শিক্ষার কোন দাম নেই।” নিজ নিজ সৃজনশীল চিন্তাধারা এবং বিদ্যা-বুদ্ধির সমৃদ্ধিই মানুষকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রেই জ্ঞান শুধু মাত্র কাগুজে সার্টিফিকেটের বেড়াজালে আজীবন আবদ্ধ হয়ে থেকে যায় - বদ্ধ জলাশয়ে আবদ্ধ মাছের মতো সমুদ্রের সন্ধান কখনোই পায় না। আইজাক নিউটন একদা বলেছিলেন, “যা আমাদের জানা, তা এক ফোঁটা; যা অজানা, তা এক মহাসাগর।” কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে কিছুই জানে না তাদের ধারণা হতেই পারে যে তারা যা জানে সেটাই শেষ কথা। এরপর আর জানার ও শেখার কিছুই বাকি নেই। যে যতই জানুক না কেন, বাস্তবে জানা ও শেখার কোন শেষ নেই। কথায় আছে, “অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী।” তাই সঠিক ও সম্পূর্ণ তথ্য জানাটা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই আধুনিক যুগে নব নব প্রযুক্তির ব্যবহারের সাথে সাথে সঠিক তথ্য ও জ্ঞানই এনে দিতে পারে সবার জীবনে প্রকৃত সাফল্য, দেখাতে পারে উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সঠিক দিশা।

তিনটি অতি পরিচিত প্রবাদের সারকথা

অহংকার পতনের মূল             অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সবার চেয়ে বড় এবং অভ্রান্ত মনে করে। এই অতি-আত্মবিশ্বাসের ফলে সে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখতে পা...