একদিন এক চোর চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে পাশের গ্রামের একটি বনেদি বাড়িতে গেল। গিয়ে দেখল বাড়ির ষন্ডামার্কা দারোয়ান নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। তাকে বিরক্ত না করে সোজা চলে গেল ঘরের সামনে। গিয়ে দেখল যে দরজা-জানালা সব খোলা রেখেই বাড়ির মালিক কোথাও গেছেন। হয়তবা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, তাই দরজা-জানালা বন্ধ করারও সময় পাননি। ঘরে ঢুকে চুরি করতে গিয়ে টাকা-পয়সা তেমন কিছুই সে খুঁজে পেল না। কিন্তু অন্য যা কিছু দামি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব সবকিছু সে বস্তায় ভরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। যাবার পথে দেখতে পেল একজন পুলিশ বাইক চালিয়ে আসছে। চোরকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছ?” চোর বলল, “স্যার, আমাদের অনেক কষ্ট। চুরি করাটাই আমাদের পেশা। আর আপনি তো জানেন স্যার যে কর্মই ধর্ম, তাই আমি নিজ ধর্ম পালন করছি। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে টাকাপয়সা তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। আমি আমার আগের চুরি করা টাকা থেকে কিছু নিয়ে এসেছিলাম। এটা আপনি রাখেন।”
পুলিশ বলল, “সে তো ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের ধর্মও তো আমাদের পালন করতে হবে। বাড়িওয়ালা কমপ্লেইন করলে তোকে খুঁজতে আমরা তোর বাড়িতে যাব। তোকে যেন এই এলাকায় কয়েক মাস আর না দেখতে পাই।”
চোর সবিনয়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার।”
যাবার পথে কি মনে হতে নিজের ভুয়া সিমের মোবাইল বের করে পত্রিকা অফিসে ফোন করল। ফোনের ওপার থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, “হ্যালো, কে বলছেন?” চোর বলল, “আমাকে আপনি চিনবেন না। কিন্তু একটা খবর আছে। চুরি হয়েছে। সেটা জানাতেই ফোন করলাম। কিন্তু একটাই অনুরোধ, আমার পরিচয় গোপন রাখবেন।” বলে চোর কখন, কীভাবে, কোথায় চুরি করেছে তার সব বৃত্তান্ত দিয়ে দিল। ফোনে কথা শেষ হতে না হতেই কিছু লোক তাকে ঘিরে ধরল। সঙ্গের জিনিসপত্র কোথা থেকে পেয়েছে জানতে চাইলে চোর তার সদুত্তর দিতে পারল না। চোর সন্দেহে লোকগুলো তাকে বেদম পেটাতে লাগল এবং পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিল। পরদিন সকালে পত্রিকায় বাড়ির মালিকের ছবিসহ চুরির খবরটি প্রকাশিত হল এবং সাথে জনগণকে এটাও বুঝিয়ে বলা হল যে কারোরই আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। কেননা আইন আইনের পথে চলবে। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
কয়েকদিন সব ঠিকঠাক চলল। বাড়ির মালিক নিজের চুরি যাওয়া জিনিসপত্রের অধিকাংশই ফেরত পেয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ-প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই চোর খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে গেল। সেই খবর আর কোথাও প্রকাশিত হল না। চোরও কিছুদিন চুপচাপ থেকে তারপর আবার চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করল। কিন্তু এইবার আর চুরি করার সময় মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে যাবে না বলেই মনস্থির করল। বেশি দূর না গিয়ে চুরি করতে একদিন সেই পাড়ারই এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে ঢুকে পড়ল। চুরি করার আগে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে বলে রান্নাঘরে কিছু খাবার আছে কিনা দেখতে গেল। দেখল যে মাংস-ভাত রান্না করা আছে, তাই খেতে লাগল। ততক্ষণে ব্যবসায়ী বাড়িতে ফিরে এসে চোরকে দেখে চিনতে পেরে গেলেন। খাবার চুরি করার জন্য তার বাড়িতে কেউ হানা দিতে পারে বলে তার ধারণা ছিল না। ধরা পড়ে গিয়ে চোর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল আর ক্ষমা চাইতে লাগল।
ব্যবসায়ী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই চুরি করিস কেন?” চোর বলল, “দাদা, আমার কোনো রোজগার নেই, জিনিস চুরি করে সেগুলি বিক্রি করে খাই।”
ব্যবসায়ী বললেন, “আমি তোকে পুলিশে দেব না, কিন্তু তুই এই চুরি করাটা বন্ধ কর। তার বদলে তোকে আমি জিনিস বেচারই কাজ দিচ্ছি। যত টাকার জিনিস বেচতে পারবি তার ১০% কমিশন তোর। মাসের শেষে সর্বমোট যত টাকার বিক্রি হবে তার উপর বোনাসও পাবি। বল রাজি আছিস কিনা?” চোর এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
জিনিস বিক্রি করে ধীরে ধীরে তার লাভের পরিমাণ বাড়তে থাকল। অপরাধের জগৎ থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য সে ব্যবসায়ীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকল। তার নিজস্ব অর্থনৈতিক অবস্থার আরও উন্নতি হলে সে মাঝে মাঝেই তার অতীতের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার লক্ষ্যে সমাজের বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে যথাসম্ভব দান-দক্ষিণা করে একজন সুনাগরিক হিসাবে নিজের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা পালন করতে লাগল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন