ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) বাংলার নবজাগরণের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও দয়ার সাগর নামে পরিচিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কর্মজগৎ ছিল প্রথাগত রক্ষণশীল সমাজ থেকে ভিন্ন, যা দয়া, নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ প্রচলন এবং সাঁওতালদের মাঝে মানবসেবায় পূর্ণ ছিল। জীবনের শেষ ১৮ বছর তিনি ঝাড়খণ্ডের কারমাটারে 'নন্দন কানন' নামক আবাসে কাটান, যেখানে তিনি সাঁওতালদের মধ্যে অবৈতনিক স্কুল ও হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক স্থাপন করেন। এই সময় তিনি 'দয়ার সাগর' হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর উক্তিগুলোতে শিক্ষা, সত্য, শ্রম, সন্তোষ ও মানবতার গুরুত্ব ফুটে ওঠে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাইয়ের নিম্নলিখিত উক্তিটি তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধ এবং পরোপকারের বিনিময়ে পাওয়া মানুষের অকৃতজ্ঞতার এক কালজয়ী নিদর্শন।
বিদ্যাসাগর মশাই ছিলেন 'দয়ার সাগর'। তিনি অকাতরে মানুষকে সাহায্য করতেন, কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যেত যাদের তিনি সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, তারাই পরে তাঁর বিরোধিতা বা সমালোচনা করছে। একবার তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তি এসে খবর দিলেন যে, অমুক ব্যক্তি তাঁর নামে খুব নিন্দা বা সমালোচনা করছেন। শুনে বিদ্যাসাগর অবাক হওয়ার ভান করে কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর মুচকি হেসে মন্তব্য করেন:
"সে আমার নিন্দা করছে? কিন্তু আমি তো তার কোনো উপকার করেছি বলে মনে পড়ছে না!"
এর মাধ্যমে তিনি ব্যঙ্গ করে বুঝিয়েছিলেন যে— মানুষ সাধারণত যার কাছে ঋণী থাকে, তাকেই সবচেয়ে বেশি হিংসে বা ঘৃণা করে। এই গল্পটি বিভিন্ন বাংলা লেখা, প্রবন্ধ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখিত হয়, যেখানে বিদ্যাসাগরের বুদ্ধি, বাস্তববাদিতা ও মানবচরিত্র সম্পর্কে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পায়। তবে তিনি মনে করতেন, “পরের উপকারের চেয়ে বড় ধর্ম আর কিছুই নেই।”
যখন তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিচ্ছিলেন, তখন অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি খাবেন কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন: "পড়াতে না পারি, মুদির দোকান করব; আলু-পটল বিক্রি করব, তবু অন্যায় সহ্য করব না।" কথাটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে জীবিকা যাই হোক, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা উচিত নয়।
তাঁর বাণী আজও প্রাসঙ্গিক, “চোখের সামনে মানুষ অনাহারে মরবে, ব্যাধি, জরা, মহামারীতে উজাড় হয়ে যাবে, আর দেশের মানুষ চোখ বুজে ভগবান ভগবান করবে—এমন ভগবৎ প্রেম আমার নেই। আমার ভগবান আছে মাটির পৃথিবীতে।” এতে তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে—মানুষের সেবা ও দুঃখ লাঘবকেই তিনি প্রকৃত ধর্ম বলে মনে করতেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়' (দ্বিতীয় ভাগ) গ্রন্থের শিক্ষণীয় গল্পে ভুবন নামের এক চোর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে তার মাসির কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল। ভুবনের ছোটখাটো চুরিতে মাসি বাধা না দেওয়ায় তার সাহস বেড়ে গিয়েছিল, তাই শেষ সময়ে সে মাসিকে দোষী করে এই চরম শাস্তি দেয়। ভুবন ছোটবেলা থেকে চুরি করত, কিন্তু মাসি শাসন না করে বরং প্রশ্রয় দিত। বড় চুরির অপরাধে পুলিশ যখন ভুবনকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে মাসির কান কামড়ে দেয়। ভুবন মাসিকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, ছোট অপরাধের সময় শাসন না করার ফলেই আজ সে বড় অপরাধী হয়েছে। শিক্ষণীয় বার্তা: অন্যায়কে শুরুতে শাসন না করলে তা পরে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এটি মূলত একটি নীতিশিক্ষামূলক গল্প, যা আমাদের ভুলকে শুরুতে শুধরে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন