আজকের দিনে মাদকাসক্তির দৃশ্যপট দ্রুত বদলেছে। সিনেমার পর্দায় মাদকাসক্তিকে যেভাবে কেবল অন্ধকার গলি বা অপরাধ জগতের সাথে যুক্ত করে দেখানো হতো, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক আলাদা। বর্তমানে এই মরণফাঁদ লুকিয়ে আছে স্কুলের ক্লাসরুমে, অফিসের ডেস্কে কিংবা আমাদের একেবারে পাশের বাড়ির চেনা মুখটির আড়ালে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী যুবসমাজ এই ঝুঁকির মুখে সবচেয়ে বেশি রয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে গভীর কিছু কারণ কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধুদের চাপ (Peer Pressure), পড়াশোনার চাপ, একাকীত্ব, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে অনেক সময় তারা মাদকের পথ বেছে নেয়। কয়েক দশক ধরে মাদকবিরোধী প্রচারণায় কেবল ভয় দেখানো বা "মাদককে না বলুন" স্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো, কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্ব বলছে, শুধু ভয় দেখিয়ে তরুণদের ফেরানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা ও বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা। মাদকাসক্তিকে কোনো অপরাধ বা চরিত্রের খামতি নয়, বরং একটি ক্রনিক মানসিক ও শারীরিক রোগ হিসেবে দেখা জরুরি।
মাদকের ভয়াবহতা শুধু ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, মাদক মানুষের চিন্তাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয় এবং দীর্ঘদিন সেবনের ফলে হৃদরোগ, লিভারের সমস্যা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নষ্ট হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল প্রশাসনের কঠোর আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ঢাল হলো পরিবার। অভিভাবকদের প্রতি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সন্তানদের ওপর অতিরিক্ত সন্দেহ বা শাসন না করে তাদের বন্ধু হয়ে ওঠা এবং তাদের সমস্যাগুলো মন দিয়ে বোঝা। সন্তান বা বন্ধুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, যেমন—খিটখিটে মেজাজ, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত টাকা খরচের মতো লক্ষণ দেখা দিলে তার সাথে সরাসরি ও নরম ভাষায় কথা বলা উচিত। এছাড়া তরুণদের খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা গেলে তারা সহজেই এই নেতিবাচক পথ থেকে দূরে থাকতে পারবে।
একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে 'প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন'—এই তিন স্তরের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। স্কুল-কলেজ স্তরে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কাউন্সেলিং এবং আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য সঠিক ডি-অ্যাডিকশন থেরাপির ব্যবস্থা করা জরুরি। যারা সুস্থ হয়ে ফিরছেন, তাদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূর করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া পুরোপুরি সম্ভব এবং প্রয়োজনে মাদক পদার্থ নিষেধ আসুচনা কেন্দ্র হেল্পলাইন (MANAS/ National Narcotics Helpline: 1933) বা স্থানীয় পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাহায্য নেওয়া উচিত। একটি সুস্থ ও সচেতন প্রজন্মই পারে দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন