বর্তমান সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অপরাধের রাজনীতিকরণ’ (Politicization of Crime) একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গুরুতর ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় অপরাধকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করার কথা থাকলেও, বর্তমানে তা অনেকাংশে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত বা প্রভাবিত হচ্ছে। যখন কোনো অপরাধ, অপরাধী কিংবা সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আইনি চশমায় না দেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখনই এই সংকটের জন্ম হয়। এটি মূলত অপরাধের তদন্ত, বিচার এবং এর প্রতি সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে তোলে।
এই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান রূপ হলো অপরাধীদের ঢালাওভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা। বর্তমান সময়ে অনেক রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের পেশী শক্তি বৃদ্ধি কিংবা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে স্থানীয় অপরাধী, মাফিয়া বা কুখ্যাত গুন্ডা-মাস্তানদের নিজেদের দলে টানে অথবা তাদের পরোক্ষ সুরক্ষা দেয়। এর বিনিময়ে নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের ভোটব্যাংক দখল করা, বিরোধী পক্ষকে দমন করা কিংবা নির্বাচনী সহিংসতা ছড়ানোর কাজে এই অপরাধীদের সফলভাবে ব্যবহার করা হয়। ফলে অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এক ধরনের অলিখিত দায়মুক্তি পেয়ে যায়।
অপরাধের রাজনীতিকরণের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার। পুলিশ বা বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থাকে তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করতে না দিয়ে, অনেক সময় শাসক দলগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হয়। এর ফলশ্রুতিতে দেখা যায়, কোনো অপরাধী যদি শাসক বা নিজের দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তবে সে অনায়াসে পার পেয়ে যায়। অপরদিকে, অপরাধী যদি বিরোধী পক্ষের কেউ হয়, তবে তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও কখনো কখনো পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এই দ্বিমুখী নীতি আইনের নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করছে।
একই সাথে, কোনো বড় অপরাধ বা চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি ঘটলে মূল ঘটনাকে আড়াল করতে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক মহল থেকে সুকৌশলে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। জনগণের তীব্র ক্ষোভ প্রশমিত করতে বা মূল অপরাধীকে রক্ষা করতে বিষয়টিকে অন্য কোনো রাজনৈতিক রঙ, যেমন—সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা দীর্ঘদিনের দলগত দ্বন্দ্বের রূপ দিয়ে প্রচার করা হয়। এর ফলে জনমত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় এবং মূল অপরাধটি ঢাকা পড়ে যায়। সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে অপরাধের এই সিলেক্টিভ আউটরেজ বা পক্ষপাতমূলক প্রতিক্রিয়া ন্যায়বিচারের পথকে সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেয়।
এই মারাত্মক ব্যাধির সাথে ‘রাজনীতির অপরাধীকরণ’ বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত, যা দক্ষিণ এশিয়ার (বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশ) রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাজনীতির অপরাধীকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে অপরাধীরা বাইরে থেকে রাজনীতিকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি নিজেরা সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তারা অর্থ ও পেশী শক্তি খাটিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে নীতি-নির্ধারণী বা নেতৃত্বের আসনে বসে পড়ে এবং নিজেদের পূর্বের ও বর্তমানের সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য স্থায়ী আইনি সুরক্ষার প্রাচীর গড়ে তোলে।
বিভিন্ন সমীক্ষা ও রিপোর্টেও এই অন্ধকার চিত্রটি বারবার ফুটে উঠেছে। যেমন—ভারতে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’ (ADR)-এর রিপোর্ট অনুসারে, বহু সংখ্যক বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কদের বিরুদ্ধে আদালতে গুরুতর অপরাধের মামলা ঝুলছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক সময় এই অপরাধী-রাজনীতিকদের নির্বাচনে জয়ের হার সাধারণ ও সৎ প্রার্থীদের চেয়ে অনেক বেশি হয়, কারণ তারা অবাধে কালো টাকা ও বাহুবল ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশেও এই বিষয়টি প্রায়শই ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’ হিসেবে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়, যেখানে নির্বাচনী সহিংসতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভূমি দখলের মতো ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্য করা যায়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই সংকটের পেছনে প্রধান কারণ হলো ক্ষমতার চরম লোভ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র ক্ষমতারক্ষী মনোভাব। রাজনৈতিক ক্ষমতা যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে বা দ্রুত সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য দলগুলো অপরাধীদের সাথে অনৈতিক সমঝোতায় লিপ্ত হয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের দুর্বল আইনি ব্যবস্থা ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা। যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে এবং দ্রুত কার্যকর হয় না, তখন অপরাধীরা খুব সহজেই রাজনৈতিক দলের পতাকার নিচে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ মনে করে। এছাড়া জনগণের মধ্যে যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবও অপরাধীদের ক্ষমতার শীর্ষে বসার সুযোগ করে দেয়।
অপরাধের এই রাজনীতিকরণের ফলে সামগ্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, যখন রাজনীতি অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে অপরাধের ওপর ভরসা করতে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মন থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শাস্তির ভয় দুই-ই উধাও হয়ে যায়, যার ফলশ্রুতিতে সমাজে অপরাধের গ্রাফ আরও উর্ধ্বমুখী হতে থাকে। একই সাথে তদন্ত প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
এই বিষাক্ত সংস্কৃতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের গণতান্ত্রিক পরিবেশ। সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে এবং সততার রাজনীতি নির্বাসনে গিয়ে বাহুবল ও কালো টাকার রাজনীতি প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে। এর ফলে সৎ, শিক্ষিত ও যোগ্য মানুষরা দিন দিন রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, যা একটি দেশের দূরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য চরম অশনিসংকেত। নারী, শিশু ও সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষের নিরাপত্তা এর ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে এবং ধর্ম, জাতি ও দলের ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজন ও সহিংসতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই ভয়াবহ অন্ধকার অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং সমাজকে মুক্ত করতে হলে এখনই কিছু কঠোর ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, আইন ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ করতে হবে এবং পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ক্ষমতা দিতে হবে। দেশের ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম’ বা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ বা দ্রুত বিচার আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সময় না পায়।
সর্বোপরি, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা এই ধারাকে রুখে দিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে। দলগুলোকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা কোনো দাগী বা চিহ্নিত অপরাধীকে দলে স্থান দেবে না এবং নির্বাচনে কোনো টিকিট দেবে না। একই সাথে সাধারণ ভোটারদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে ভোট দেওয়ার সময় তারা প্রার্থীর দল দেখার আগে তার অতীত রেকর্ড, চরিত্র, শিক্ষা ও সততাকে প্রাধান্য দেন। গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সামাজিক নৈতিকতা বৃদ্ধি ও নিরপেক্ষ সত্য তুলে ধরতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের রাজনীতিকরণ যতদিন চলবে, দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র ততদিন অবরুদ্ধ থাকবে; তাই একটি নিরাপদ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে রাজনীতিকে অপরাধমুক্ত করা আজ সময়ের দাবি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন