মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

প্রকৃতির জাদুকর

 
তানিয়া ম্যাডাম: শুভ সকাল, খুদে বন্ধুরা! তোমরা কি জানো, আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতে এমন এক ছোট্ট জাদুকর আছে, যে নিজে না থাকলে আমরা আমাদের প্রিয় আম, লিচু বা কোনো মিষ্টি ফলই পেতাম না? হ্যাঁ, আমি আমাদের গুনগুন করা বন্ধু মৌমাছির কথাই বলছি। আজ আমরা কোনো কঠিন পড়াশোনা করব না; বরং গল্পে গল্পে জানব এই ছোট্ট মৌমাছিরা ডিম থেকে কীভাবে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, কীভাবে তারা কথা না বলেই নিখুঁত নাচ দিয়ে নিজেদের মনের ভাষা প্রকাশ করে, আর এক ফোঁটা মধুর জন্য কতটা কঠোর পরিশ্রম করে। 

আজ কে কে টিফিনে পাউরুটি আর মধু খেয়ে এসেছ বলতো?

আকাশ: (হাত তুলে) ম্যাডাম আমি! মধু আমার ভীষণ প্রিয়। একদম চটচটে আর মিষ্টি!

মিলি: কিন্তু ম্যাডাম, এই মধু আসে কোথা থেকে? বাবা বলে মৌমাছিরা নাকি কামড়ালে খুব বিষ হয়! তারা এত মিষ্টি মধু বানায় কী করে?

তানিয়া ম্যাডাম: বাঃ, মিলি খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছে! আজ তোমাদের বই খাতা বন্ধ। আজ আমি তোমাদের আমাদের প্রকৃতির সবচেয়ে পরিশ্রমী এক ছোট্ট বন্ধু আর তার জাদুনগরীর গল্প শোনাব। তার নাম ডনুএকটি ছোট্ট কর্মী মৌমাছি (Worker Bee)আর তাদের জাদুনগরী হলো তাদের মৌচাক

রাই: ম্যাডাম, ডনু কি জন্ম থেকেই ডানা মেলে উড়তে পারত?

তানিয়া ম্যাডাম: একদমই না রাই! ডনু আজ থেকে ঠিক ২১ দিন আগে এই পৃথিবীতে এসেছিল। মৌচাকের ভেতরে হাজার হাজার ছোট ছোট মোমের ঘর থাকে, যেগুলোকে আমরা বলি ষড়ভুজাকৃতি প্রকোষ্ঠএই জাদুনগরীর একজনই আসল প্রধানতিনি হলেন রানী মৌমাছি (Queen Bee)রানী মা আকারে সবচেয়ে বড় হন এবং তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৫০০টি ডিম পাড়েন! ডনুর জন্ম হয়েছিল ৪টি ধাপে:

প্রথম ধাপ - ডিম (Egg): রানী মা একটা ছোট্ট ঘরে একটা ডিম পারলেন৩ দিন ডিমটি সেখানে আরাম করল।

দ্বিতীয় ধাপ - লার্ভা (Larva): ৩ দিন পর ডিম ফুটে বেরোলো ছোট্ট একটা শুঁয়োপোকার মতো 'লার্ভা'ডনুর তখন কোনো পা বা ডানা ছিল না। সে শুধু হাঁ করে থাকত, আর মৌচাকের বড় দিদিরা তাকে পুষ্টিকর 'রয়্যাল জেলি' আর মধু খাইয়ে দিত। খেতে খেতে মাত্র ৫ দিনে ডনু মস্ত বড় হয়ে গেল!

তৃতীয় ধাপ - পিউপা (Pupa): এবার দিদিরা সেই ঘরের মুখটা মোম দিয়ে বন্ধ করে দিল। ভেতরে অন্ধকার ঘরে ডনু নিজেকে একটা রেশমি গুটিতে গুটিয়ে নিল। একে বলে 'পিউপা'এই অন্ধকারের মধ্যেই ম্যাজিক হলো! আস্তে আস্তে ডনুর ছ'টা পা, দুটো চোখ আর সুন্দর দুটো ডানা গজাতে শুরু করল।

চতুর্থ ধাপ - পূর্ণাঙ্গ মৌমাছি (Adult Bee): পিউপা অবস্থায় ১২ দিন কাটানোর পর, ডনু তার ধারালো মুখ দিয়ে মোমের ঢাকনাটা কেটে বাইরে বেরিয়ে এলো। ব্যস! ডনু এখন পুরোপুরি তৈরি!

আকাশ: ম্যাডাম, ডনু কি জন্মানোর পরেই উড়াল দিল? আমাদের মতো স্কুলেও গেল না?

তানিয়া ম্যাডাম: (হেসে) মৌচাকে তো স্কুল নেই আকাশ, কিন্তু সেখানে কড়া নিয়ম আছে! মৌচাকে তিন ধরণের মৌমাছি থাকে:

রানী মৌমাছি: পুরো চাকে একজনই থাকে। তার কাজ শুধু ডিম পাড়া।

পুরুষ মৌমাছি (Drone): এরা সংখ্যায় কয়েকশো থাকে। এরা অলস প্রকৃতির, কোনো কাজ করে না, এমনকি এদের কামড়ানোর হুলও থাকে না!

কর্মী মৌমাছি: এরা সবাই মেয়ে মৌমাছি। ডনু হলো এই দলের। ঘর পরিষ্কার করা, বাচ্চাদের খাওয়ানো, মোম দিয়ে চাক বানানো আর বাইরে থেকে মধু আনাসব কাজ এদেরই করতে হয়। একটা চাকে এরা প্রায় ২০ থেকে ৮০ হাজার থাকে!

ডনু বড় হয়ে প্রথমে ঘর পরিষ্কারের কাজ করল, তারপর বাচ্চাদের আয়া হলো, আর সবশেষে ২০ দিন বয়সে সে পেল সবচেয়ে বড় দায়িত্বমধু খোঁজার কাজ!

মিলি: ম্যাডাম, ডনু বাইরে গিয়ে ফুল খুঁজে পায় কী করে? তারা কি একে অপরকে ডাকে?

তানিয়া ম্যাডাম: মৌমাছিদের তো মোবাইল ফোন নেই মিলি, তাই তাদের কথা বলার ধরণটা খুব মজার! ডনু যখন উড়ে উড়ে একটা চমৎকার সর্ষে খেত খুঁজে পেল, সে তখন ফুলের মিষ্টি রস বা মকরন্দ (Nectar) চুষে নিল আর পেছনের পায়ের থলিতে ফুলের গুঁড়ো বা পরাগরেণু জমিয়ে নিল।

এরপর সে যখন মৌচাকে ফিরে এলো, বাকি বন্ধুদের খবর দেওয়ার জন্য সে একটা জাদুকরী নাচ শুরু করল! একে বিজ্ঞানীদের ভাষায় বলে ওয়াগেল ড্যান্স (Waggle Dance)

রাই: নাচ দেখিয়ে ঠিকানা বোঝায়? কীভাবে ম্যাডাম?

তানিয়া ম্যাডাম: হ্যাঁ রাই! ডনু যদি ইংরেজি '8' অক্ষরের মতো করে গোল গোল ঘুরে ঘুরে ডানা ঝাঁকায়, তবে বাকি মৌমাছিরা বুঝে যায় ফুল কত দূরে আছে। যদি সে ওপরের দিকে মুখ করে নাচে, তার মানে ফুল সূর্যের দিকে আছে। এই নাচ দেখে সব মৌমাছিরা দল বেঁধে সোজা সেই ফুলের বাগানে চলে যায়।

আকাশ: ম্যাডাম, এক চামচ মধু বানাতে ডনুদের কতদিন সময় লাগে?

তানিয়া ম্যাডাম: শুনলে তোমরা অবাক হয়ে যাবে আকাশ!

এক ফোঁটা মধুর কষ্ট: মাত্র ৪৫০ গ্রাম মধু তৈরি করতে মৌমাছিদের প্রায় ২০ লক্ষ ফুলে বসতে হয়! আর তার জন্য তাদের যতখানি উড়তে হয়, তা দিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে তিনবার ঘুরে আসা যায়!

সুপার স্পীড: ওড়ার সময় মৌমাছিরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ বার ডানা ঝাপটায়! আর এই জন্যই "ভঁ ভঁ" শব্দটা তৈরি হয়।

মৌচাকের এসি (AC): গরম কালে মৌচাকের ভেতরটা ঠাণ্ডা রাখার জন্য ডনু আর তার বন্ধুরা সবাই মিলে একসঙ্গে ডানা ঝাপটে হাওয়া করে। ঠিক যেন প্রকৃতির তৈরি এয়ার কন্ডিশনার!

হুল ফোটানোর রহস্য: মিলি প্রথমে বলেছিল না যে এরা কামড়ালে বিষ হয়? আসলে কর্মী মৌমাছিরা খুব শান্ত। তারা শুধু তখনই হুল ফোটায় যখন কেউ তাদের বাড়ি অর্থাৎ মৌচাক ভাঙতে আসে। আর মানুষের চামড়া শক্ত হওয়ায়, হুল ফোটানোর পর সেটি আর টেনে বার করতে পারে না। ফলে হুলটি ছিঁড়ে মৌমাছিটি নিজেই মারা যায়। তাই তারা ইচ্ছে করে কাউকে কামড়ায় না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন্ধু: মৌমাছিরা যদি ফুল থেকে ফুলে না বসত, তবে গাছে কোনো ফল বা ফসল হতো না। আমরা কোনো খাবারই পেতাম না!

মিলি: ওরে বাবা! তার মানে মৌমাছিরা না থাকলে আমরা আম, জাম, কাঁঠাল কিছুই পেতাম না?

তানিয়া ম্যাডাম: একদম ঠিক ধরেছ মিলি! তাই ডনু আর তার বন্ধুরা আমাদের প্রকৃতির সবচেয়ে বড় জাদুকর। এরপর থেকে মৌমাছি দেখলে কেউ ভয় পাবে না আর তাদের মারতেও যাবে না, ঠিক আছে?

সবাই একসঙ্গে: ঠিক আছে ম্যাডাম! আজ থেকে ডনু আমাদের বন্ধু!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন